বিনোদন

বাবা, দুই মা ও ১২ ভাইবোন নিয়ে যেমন ছিল কবরীর শৈশব

বিনোদন প্রতিবেদক

৭০ বছর বয়সে করোনার থাবায় না ফেরার দেশে চলে গেছেন চলচ্চিত্রের ‘মিষ্টি মেয়ে’ সারাহ বেগম কবরী। ১৯৫০ সালের ১৯ জুলাই এই কিংবদন্তির জন্ম হয়েছিল চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে। পরিবারের সঙ্গে থাকতেন সেখানকার ফিরিঙ্গিবাজার নামে একটি এলাকায়। কবরীর বাবা শ্রীকৃষ্ণ দাস পাল, মা শ্রীমতি লাবণ্য প্রভা পাল। এই দম্পতির ছেলে পাঁচজন, মেয়ে চারজন। কবরী ছিলেন চার বোনের মধ্যে দ্বিতীয়।

কিংবদন্তি এই অভিনেত্রীর মা শ্রীমতি লাবণ্য প্রভা পাল ছিলেন তার বাবার দ্বিতীয় স্ত্রী। সৎমায়ের দুই ছেলে, দুই মেয়ে। মোট ১৩ ভাইবোন, বাবা ও দুই মাকে নিয়েই ছিল কবরীর পরিবার। ফিরিঙ্গি বাজারে নায়িকার শৈশবও কেটেছে ভাইবোনদের সঙ্গে আনন্দ উচ্ছলতার মধ্য দিয়ে। সে সব স্মৃতি তিনি একবার শেয়ার করেছিলেন একটি জাতীয় দৈনিকের সাক্ষাৎকারে হাজির হয়ে।

ওই সাক্ষাৎকার থেকে জানা যায়, কবরীর পূর্ব নাম ছিল মিনা পাল। তাদের গোটা পরিবার ছিল ভীষণ সংস্কৃতিমনা। তার বড় দুই বোন নাচ করতেন। ছোট ভাই তবলা বাজাতেন। ছোটবেলায় কবরী নাচ-গান একসঙ্গে করতেন। অভিনেত্রী জানান, ‘ছোট্টবেলার কথা আমার যেটুকু মনে আছে, তা হলো খুব সকালে ঘুম থেকে উঠে ভাইবোনেরা একসঙ্গে স্কুলে যেতাম।’

চট্টগ্রামের ফিরিঙ্গিবাজারে থাকাকালীন কবরী প্রথম ভর্তি হন আল করন নামে একটি স্কুলে। সেখানে তিনি চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করেন। এরপর তাদের জে এম সেন হাইস্কুলে ভর্তি করা হয়। সে সময়কার স্মৃতিচারণ করে কবরী বলেছিলেন, ‘আমরা প্রতি রাতে ঘুমোতে যাওয়ার আগে কাপড় ভাঁজ করে মাথার বালিশের নিচে রেখে দিতাম। এভাবেই কাপড় ইস্তিরি হয়ে যেত। সকালে ওই কাপড় পরেই স্কুলে যেতাম।’

ঘরে কোনো টেলিভিশন না থাকায় রেডিওতে গান শুনে কবরী ও তার বোনেরা নাচতেন, আবার কেউ গলা মিলিয়ে গান গাইতেন। এরপর তিনি রুনু বিশ্বাস নামে একজনের কাছে নাচ শেখা শুরু করেন। কিন্তু তার মা তাদের নাচ-গান বাদ দিয়ে মন দিয়ে পড়াশোনা করতে বলতেন। সন্ধ্যা হলেই সন্তানদের পড়তে বসার তাগাদা দিতেন। তবে তার বাবা মেয়েদের খুব উৎসাহ দিতেন। তিনিই কবরীদের সংস্কৃতিমনা করে গড়ে তোলেন।

একদিন তাদের স্কুলে ‘ক্ষুধা’ নামে নাটক মঞ্চস্থ হবে বলে ঠিক হলো। কিন্তু যে ছেলেটির নাটকে অভিনয় করার কথা, সে আসেনি। অগত্যা কবরীকে তার জায়গায় অভিনয় করতে বলা হলো। এভাবেই তিনি প্রথম নাটকে অভিনয় করলেন। এরপর থেকে বোনদের সঙ্গে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে নাচতেন নায়িকা। ওদিকে পড়াশোনা যেন ঠিক থাকে, তার জন্য ছিল মায়ের তাড়া। এভাবেই ভাইবোনদের সঙ্গে বেড়ে উঠেছেন কবরী।

এর পরের ইতিহাস কমবেশি সবারই জানা। কীভাবে তিনি মিনা পাল থেকে কবরী সারোয়ার হলেন, কীভাবে চলচ্চিত্রে আসলেন, হয়ে উঠলেন ঢাকাই সিনেমার ‘মিষ্টি মেয়ে’। অভিনয় সত্তাকে টিকিয়ে রেখে আবার তিনি আত্মপ্রকাশ করলেন চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে। এরপর তার পা পড়ল রাজনীতির মাঠেও। হলেন সংসদ সদস্য। অভিনয় জীবনে অসংখ্য মানুষের ভালোবাসা পেয়েছেন কবরী। পেয়েছেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ও আজীবন সম্মাননার মতো বড় স্বীকৃতিও।

কিন্তু সব ফেলে ৭০ বছর বয়সে না ফেরার দেশে চলে গেলেন ‘সারেং বউ’ খ্যাত এই অভিনেত্রী। মহামারি করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে শুক্রবার দিনগত রাত ১২টা ২০ মিনিটে রাজধানীর শেখ রাসেল গ্যাস্ট্রোলিভার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান অভিনেত্রী, পরিচালক ও রাজনীতিক কবরী। তিনি লাইফ সাপোর্টে ছিলেন। গত ৫ এপ্রিল তার করোনা পজিটিভ আসে। সেদিন রাতেই তাকে রাজধানীর কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

৭ এপ্রিল রাতে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে চিকিৎসকরা তাকে আইসিইউতে নেয়ার পরামর্শ দেন। কিন্তু কুর্মিটোলা হাসপাতালে কোনো আইসিইউ বেড খালি না থাকায় ৮ এপ্রিল দুপুরে কবরীকে শেখ রাসেল গ্যাস্ট্রোলিভার হাসপাতালের আইসিইউতে ভর্তি করা হয়। সেখানে অবস্থা আরও খারাপ হলে তাকে লাইফ সাপোর্ট নেয়া হয়। শুক্রবার দিনগত রাত ১২টা ২০ মিনিটে অভিনেত্রীকে মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসকরা।

নিজের সম্পর্কে বলতে গিয়ে কবরী একটা সাক্ষাৎকারে মন্তব্য করেছিলেন, ‘সারা জীবন অনেক দিয়েছি। কিন্তু নিতে আমার খুবই কষ্ট। কারণ মনে হয় যে নিজে নিতে গেলে আমি ছোট হয়ে যাব। নিতে গেলে মনে হবে, আমি একজন দুর্বল মানুষ হয়ে উঠছি। যে ভালোবাসে, সব সময় সে মনে করে, ভালোবাসাটাই বড় কাজ। সব সময় মানুষকে তো দিয়েই গেলাম। কারও কাছ থেকে কিছু পাইনি। কারও কাছ থেকে কিছু চাইওনি। এই যে সবাইকে দিয়ে গেলাম, ভালোবেসে গেলাম, তার বিনিময় প্রত্যাশা করাটা অনুচিত।’

আরও দেখুন

এ বিষয়ের আরও সংবাদ

Close