জাতীয়

২০ বছরেও নিষ্পত্তি হয়নি বটমূলের বিস্ফোরক মামলা

নিজস্ব প্রতিবেদক

২০ বছর পার হতে চললেও রাজধানীর রমনা বটমূলে পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠানে বোমা হামলায় মৃত্যু ও হতাহতের ঘটনায় দায়ের করা বিস্ফোরক আইনের মামলা নিষ্পত্তি হয়নি আজও। এর জন্য মামলার তদন্ত কর্মকর্তা (আইও) সিআইডির পরিদর্শক আবু হেনা মো. ইউসুফ অসুস্থতাকে দায় দিচ্ছেন তদন্তকারী কর্মকর্তারা। তারা বলছেন, প্যারালাইসিস রোগে ভুগছেন আইও আবু হেনা। যার ফলে মামলার স্বাভাবিক কার্যক্রম বিলম্ব হচ্ছে। পাশাপাশি করোনা পরিস্থিতি মোকাবেলায় আদালত চলছে সীমিত পরিসরে। ফলে নিষ্পত্তি হতে সময় লাগছে রমনা বটমূলের বোমা হামলার ঘটনায় দায়ের করা বিস্ফোরক আইনের মামলার।

বাংলা নতুন বর্ষ বরণ করতে ২০০১ সালে রাজধানীর রমনা বটমূলে ছায়ানট আয়োজন করে একটি অনুষ্ঠানের। সেখানে বোমা বিস্ফোরণের ঘটনায় নিহত হন ১০ জন। আহত হন অনেকেই।

বটমূলের ওই ঘটনায় হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে আলাদা দুটি মামলা দায়ের করা হয়। হত্যা মামলার বিচারিক আদালতের রায় সাত বছর আগেই ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু বিস্ফোরক আইনে দায়ের করা মামলাটি ২০ বছর পার হয়ে গেলেও এখনও বিচারিক কার্যক্রম শেষ হয়নি। অপরদিকে হত্যা মামলার বিচারিক কার্যক্রম শেষ হলেও আপিল শুনানি শুরু হয়নি। শুনানির জন্য আপিল আবেদনটি হাইকোর্টের কার্য তলিকায় রয়েছে।

জানতে চাইলে বিস্ফোরক মামলার রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী সংশ্লিষ্ট ট্রাইব্যুনালের পাবলিক প্রসিকিউটর আবু আব্দুল্লাহ ভুইয়া বলেন, ‘মামলাটি সাক্ষ্যগ্রহণের শেষ পর্যায়ে। গত ৫ এপ্রিল সাক্ষ্য গ্রহণের জন্য তারিখ নির্ধারণ ছিল। কিন্তু এ মামলার তদন্ত কর্মকর্তা (আইও) সিআইডির পরিদর্শক আবু হেনা মো. ইউসুফ প্যারালাইসজড। তিনি আসতে পারেননি। এদিকে করোনা পরিস্থিতির কারণে আদালতের কার্যক্রম সীমিত পরিসরে চলছে। সাক্ষ্যগ্রহণ সম্ভব হয়নি। এ সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হলে মামলার সাক্ষ্য গ্রহণের কার্যক্রম সম্পন্ন হবে।’

মামলায় মোট ৮৪ জন সাক্ষীর মধ্যে ৫৫ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়েছে বলেও জানান রাষ্ট্রপক্ষের এই আইনজীবী।

এদিকে রমনা বটমূলের ঘটনায় দায়ের করা হত্যা মামলায় ডেথ রেফারেন্স ও আসামিরা জেল আপিল করেছেন হাইকোর্টে।

জানতে চাইলে মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্ত আসামি মাওলানা আকবর হোসাইনের আইনজীবী মো. মাসুদ রানা বলেন, বিচারিক আদালতের ফাঁসির সাজা থেকে খালাস চেয়ে হাইকোর্টে আপিল করেছেন মাওলানা আকবর হোসাইন। তার আপিলটি হাইকোর্টের একটি বেঞ্চে শুনানির জন্য রয়েছে। প্রধান বিচারপতি এ আপিল শুনানির জন্য বিচারপতি কৃষ্মা দেবনাথের বেঞ্চে মামলাটি পাঠিয়েছেন। করোনা পরিস্থিতির কারণে আদালত বসছে না। হাইকোর্ট এখন সীমিত পরিসরে ভার্চুয়ালি ৪টি বেঞ্চ মামলা শুনানি করছে। কোর্ট নিয়মিত চালু হলে আমরা আপিল ‍শুনানির জন্য প্রস্তুতি নিব।

বিস্ফোরক আইনে দায়ের করা মামলাটি ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১ এর বিচারক আবু জাফর মো. কামরুজ্জামানের আদালতে বিচারাধীন রয়েছে।

ঘটনার বিবরণ থেকে জানা যায়, ২০০১ সালে পহেলা বৈশাখে রমনা বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে বোমা বিস্ফোরণে ১০ জন নিহত ও ২০ জন আহত হন। এরপর ওই ঘটনায় নীলক্ষেত পুলিশ ফাঁড়ির সার্জেন্ট অমল চন্দ্র চন্দ রমনা থানায় হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে দুটি মামলা করেন। দীর্ঘ তদন্ত শেষে ২০০৮ সালের ২৯ নভেম্বর হরকাতুল জিহাদ (হুজি) নেতা মুফতি আবদুল হান্নানসহ ১৪ জনকে অভিযুক্ত করে সিআইডির পরিদর্শক আবু হেনা মো. ইউসুফ আদালতে হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে দুটি সম্পূরক অভিযোগপত্র দাখিল করেন।

২০১৪ সালের ২৩ জুন হত্যা মামলাটির রায় ঘোষণা করেন ঢাকার দ্বিতীয় অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালত। রায়ে নিষিদ্ধ ঘোষিত হরকাতুল জিহাদের (হুজি) শীর্ষ নেতা মুফতি আবদুল হান্নান, বিএনপি নেতা ও সাবেক উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুর ভাই মাওলানা তাজউদ্দিনসহ ৮ জনের মৃত্যুদণ্ড এবং ছয়জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত অন্য আসামিরা হলেন- মাওলানা আকবর হোসাইন, হাফেজ জাহাঙ্গীর আলম বদর (পলাতক), মাওলানা আবু বকর, মুফতি আব্দুল হাই (পলাতক),মুফতি শফিকুর রহমান (পলাতক), মাওলানা তাজউদ্দিন (পলাতক) ও আরিফ হাসান সুমন। আসামিদের মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার আদেশ দেন আদালত। এ ছাড়াও তাদের প্রত্যেককে ৫০ হাজার টাকা করে জরিমানা করা হয়।

যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা হলেন- হাফেজ ইয়াহিয়া, মাওলানা শওকত ওসমান ওরফে শেখ ফরিদ, হাফেজ মাওলানা আবু তাহের, মাওলানা সাব্বির, মাওলানা আব্দুর রউফ ও মাওলানা শাহাদাৎ উল্লাহ জুয়েল। ৩০২/৩৪ ধারায় তাদের যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড এবং প্রত্যেককে ৫০ হাজার টাকা করে জরিমানা, অনাদায়ে আরও এক বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

অপরদিকে, বিস্ফোরক আইনে করা মামলাটিতে ২০১৪ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১ মুফতি হান্নানসহ ১৪ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন।

বিস্ফোরক মামলার অভিযুক্তরা হলেন- মুফতি আব্দুল হান্নান, মাওলানা আকবর হোসাইন, মুফতি আব্দুল হাই, হাফেজ জাহাঙ্গীর আলম বদর, মাওলানা আবু বকর, মুফতি শফিকুর রহমান, মাওলানা তাজউদ্দিন, আরিফ হাসান সুমন, হাফেজ মাওলানা আবু তাহের, মাওলানা সাব্বির, হাফেজ ইয়াহিয়া, মাওলানা শওকত ওসমান ওরফে শেখ ফরিদ, মাওলানা আব্দুর রউফ ও মাওলানা শাহাদাৎ উল্লাহ জুয়েল। মুফতি আব্দুল হান্নানকে ফাঁসি দেয়া হয় ২০১৭ সালের ১২ এপ্রিল রাতে। সাবেক ব্রিটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরীর ওপর গ্রেনেড হামলার দায়ে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়।

আরও দেখুন

এ বিষয়ের আরও সংবাদ

Close