জাতীয়

বর্ণাঢ্য জীবনের অধিকারী আইনজীবী ও রাজনীতিকের বিদায়

নিজস্ব প্রতিবেদক

চলে গেলেন দেশের প্রবীণ আইনজীবী ও রাজনীতিবিদ ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। স্বাধীনতাপরবর্তী বাংলাদেশে যেসব রাজনীতিবিদ নানা কারণে আলোচনার শীর্ষে রয়েছেন তাদের একজন ছিলেন মওদুদ আহমদ। একজন খ্যাতিমান আইনজীবী ও রাজনীতিবিদ হিসেবে তার ব্যাপক পরিচিতি ছিল। এর বাইরে তিনি একজন লেখকও ছিলেন।

এরশাদের আমলে অল্প সময়ের জন্য দেশের প্রধানমন্ত্রী ও উপরাষ্ট্রপতি হয়েছিলেন মওদুদ আহমদ। তিনি বিএনপি ও জাতীয় পার্টির প্রতিষ্ঠাতাদের অন্যতম। পাঁচবারের সংসদ সদস্য। ছিলেন বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী।

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গেও মওদুদ আহমদের ঘনিষ্ঠতা ছিল। ১৯৭১ সালে ইয়াহিয়া খান আহুত গোলটেবিল বৈঠকে তিনি বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধে সংগঠকদেরও অন্যতম একজন ছিলেন তিনি। মুজিবনগর সরকার মুক্তিযুদ্ধের সময় মওদুদ আহমদকে পোস্টমাস্টার জেনারেল নিয়োগ করেছিল।

মওদুদ আহমদ ১৯৪০ সালের ২৪ মে ব্রিটিশ ভারতের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির (বর্তমান বাংলাদেশ) নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলায় জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা মাওলানা মমতাজ উদ্দিন আহমদ এবং মা বেগম আম্বিয়া খাতুন। ছয় ভাইবোনের মধ্যে মওদুদ আহমদ চতুর্থ।

তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্মান পাস করে ব্রিটেনের লন্ডনে লিঙ্কন্স ইন থেকে ব্যারিস্টার-অ্যাট-ল’ ডিগ্রি অর্জন করেন। লন্ডনে পড়াশোনা করে তিনি দেশে ফিরে আসেন এবং হাইকোর্টে ওকালতি শুরু করেন। তিনি ব্লান্ড ভিজিটিং প্রফেসর হিসেবে জর্জ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত ছিলেন। আইনজীবী হিসেবেও তার খ্যাতি ছিল। ঐতিহাসিক ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা’য় মওদুদ আহমদ অন্যতম আইনজীবী ছিলেন।

মওদুদ আহমদ ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হন। তিনি ঢাকা কলেজে উচ্চ মাধ্যমিক পড়ার সময় ওই কলেজের ছাত্র সংসদের আপ্যায়ন সম্পাদক ছিলেন। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি ফরমান উল্লাহ খানের প্রতিষ্ঠিত খেলাফত রব্বানীর ছাত্র সংগঠন ছাত্রশক্তির সঙ্গে জড়িত হয়েছিলেন। এর আগে স্কুলের ছাত্র থাকার সময় বাংলা ভাষা আন্দোলনের মিছিলে যোগ দিয়ে তিনি জেল খেটেছিলেন।

১৯৭৭-৭৯ সালে তিনি রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সরকারের মন্ত্রী ও উপদেষ্টা ছিলেন। ১৯৭৯ সালে তিনি প্রথম সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং তাকে উপ-প্রধানমন্ত্রী করা হয়। ১৯৮১ সালের মে মাসে জিয়াউর রহমান নিহত হন এবং এক বছরের ভেতর হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ রাষ্ট্রক্ষমতা গ্রহণ করেন। ১৯৮৫ এর নির্বাচনে মওদুদ আহমদ আবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং সরকারের তথ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। এক বছর পর ১৯৮৬ সালে তাকে আবার উপ-প্রধানমন্ত্রী করা হয়। ১৯৮৮ সালে তিনি প্রধানমন্ত্রী হন। ১৯৮৯ সালে তাকে শিল্প মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেয়া হয় এবং এরশাদ তাকে উপ-রাষ্ট্রপতি করেন। ৬ ডিসেম্বর ১৯৯০ সালে এরশাদ সরকার জনরোষের মুখে ক্ষমতা ছেড়ে দেয়। জাতীয় পার্টির মনোনয়ন নিয়ে ১৯৯১ সালে মওদুদ আহমদ আবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।

১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে তিনি বিএনপিতে যোগ দেন। তিনি দলটির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য হন। ২০০১ সালে তিনি বিএনপির মনোনয়ন নিয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং তাকে আইনমন্ত্রী করা হয়। তিনি নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ আসন থেকে পাঁচবারের সংসদ সদস্য। সবশেষ ২০০৮ ও ২০১৮ সালের নির্বাচনে তিনি আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে হেরে যান। তবে ২০০৮ সালের নির্বাচনে নিজ আসন থেকে পরাজিত হওয়ার পর তাকে বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া বগুড়ায় ছেড়ে দেয়া নিজের আসন থেকে বিজয়ী করে সংসদে আনেন।

মওদুদ আহমদ একজন লেখকও ছিলেন। ডজনখানেক বই লিখেছেন। ‘ডেমোক্রেসি অ্যান্ড দ্য চ্যালেঞ্জ অব ডেভেলপমেন্ট’, ‘এ স্টাডি অব পলিটিক্স অ্যান্ড মিলিটারী ইন্টারভেনশন ইন বাংলাদেশ,’ এবং ‘এরা অফ শেখ মুজিবুর রহমান, বাংলাদেশ কনস্টিটিউশনাল কোয়েস্ট ফর অটোনমি’- এসব শিরোনামে লেখা তার তিনটি বই ব্যাপক আলোচিত। এছাড়া ‘বাংলাদেশের গণতন্ত্র ১৯৯১ থেকে ২০০৬, ‘কারাগারে যেমন ছিলাম ২০০৭-২০০৮’ – এই দুটি শিরোনামের দুটি বইও ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি করেছিল। নিজের লেখা কিছু বইয়ে মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে নির্মোহ বর্ণনা থাকায় নিজ দল ও বলয়ে চাপের মুখেও পড়েন মওদুদ।

মওদুদ আহমদের স্ত্রী হাসনা মওদুদ। তিনি পল্লীকবি জসীমউদদীনের মেয়ে। হাসনা মওদুদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক এবং তিনিও এরশাদ সরকারের সময়ে সংরক্ষিত নারী আসনে এমপি হয়েছিলেন। এই দম্পতির দুই ছেলে এবং এক মেয়ে। বড় ছেলে আসিফ মওদুদ অল্প বয়সেই মারা যান অনেক আগে। আর দ্বিতীয় সন্তান আমান মওদুদ প্রতিবন্ধী ছিলেন এবং তিনিও মারা যান ২০১৫ সালে। তার মেয়ে আনা আসপিয়া মওদুদ স্বামীসহ থাকেন নরওয়েতে।

আরও দেখুন

এ বিষয়ের আরও সংবাদ

Close